মানুষের একতাই একতার শক্তি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৭০ এর ৩১ জুলাই গণমানুষের লড়াই-সংগ্রামের মুখপত্র সাপ্তাহিক একতার যাত্রা শুরু হয়। জন্মলগ্ন থেকেই একতা সমাজতন্ত্রের লড়াই-সংগ্রামে মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে এগিয়েছে। শুনিয়েছে আর্থ-সামাজিক মুক্তি ও মানবতার জয়গান। গত কয়েক দশকে দেশে সংবাদমাধ্যমের বিস্তার ও বলয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে বর্তমান সময়ে বাণিজ্যিক ধারার দৈনিক সংবাদপত্রগুলোকে যেভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে একতা তার পথচলার ৫০ বছর পেরিয়েছে আদর্শিক গৌরবে। ১৯৭০ সাল থেকে শ্রমজীবী, মেহনতি মানুষের পক্ষের এই পত্রিকার পাঁচ দশকে পদার্পণও বাংলাদেশের সংবাদপত্রের নানা চড়াই-উৎরাইয়ে এক জীবন্ত ইতিহাস। একতার জন্ম, বেড়ে উঠা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বেড়ে উঠার ইতিহাসেরই অংশ। এ দেশের মানুষের গণতন্ত্র, সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াইয়ে সবোর্পরি মেহনতি জনতার শোষণমুক্তির লড়াই ও শ্রেণি-সংগ্রামে একতা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। একতা গণমানুষের গণমাধ্যম। দেশ-দুনিয়ার আপামর জনগণের লড়াই-সংগ্রামের বার্তা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়াই একতার কাজ ও লক্ষ্য। এই কঠিন লক্ষ্যকে সামনে রেখে একতা গত অর্ধশতকের ইতিহাসে কোনোদিন পিছু ফেরেনি, কিংবা থমকে দাঁড়ায়নি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একতা তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নানা বাধা পেরিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করে যাচ্ছে। একতার এই দীর্ঘ পথচলা কখনোই কুসমাস্তীর্ণ ছিলো না। নানা সময়ে শাসকের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে একতা। কিন্তু কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারেনি। লড়াই-সংগ্রাম আর মেহনতি মানুষের বার্তা নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শুরুতেই একতা পৌঁছে গিয়েছে পাঠক-শুভানুধ্যায়ীর দুয়ারে। বর্তমান সময়ে এসে একতার দায়িত্ব আরো কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। কারণ, এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে মানুষের কাছে প্রকৃত সত্য তথ্য তুলে ধরার মতো গণমাধ্যমের খুবই অভাব। আমাদের দেশেও এই অভাব আরো প্রকট। সরকারি দলের অনেক সাংবাদিক নেতা, সরকারি পৃষ্টপোষকতা পায় এমন অনেক গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিই বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করে বলেছেন, তারা যা বলতে চান তা তারা বলতে পারেন না। তাদেরকে বাধা দেয়া হয়। এদেশের প্রতিষ্ঠিত অনেক গণমাধ্যমকর্মীই স্বীকার করেছেন, সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়। ফলে আজ জনমণে এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, দেশে শত শত গণমাধ্যম থাকা এক কথা; আর মানুষের বাকস্বাধীনতা বা তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করা বা করতে পারা সেটি আরেক কথা। শত শত গণমাধ্যম থাকলেই মানুষের লড়াই-সংগ্রামের কথা সেখানে প্রতিফলিত হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। কারণ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজির মালিক ও সরকার। কোন তথ্য মানুষের কাছে যাবে, কোন তথ্যটা গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে, সেটা ঠিক করে দেয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এ দু’পক্ষই। স্বাভাবিকভাবেই গণমানুষের লড়াই, শ্রেণি-সংগ্রাম সেই তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যমে কখনো স্থান পায় না। এজন্য চাই বিকল্প গণমাধ্যম। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একতার গুরুত্ব আরো বেশি। একতা বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই বিকল্প গণমাধ্যম যে পঞ্চাশ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এই করোনা মাহামারির সময়ে ছাপা গণমাধ্যমে বলতে গেলে ধ্বস নেমেছে। তার প্রভাব একতার ওপরেও পড়েছে। যে কারণে গত প্রায় ৬ মাস একতা ছাপা সংস্করণে বের হতে পারেনি। যা পত্রিকাটির সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবার। এতে আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক পাঠক (যারা হয়তো প্রযুক্তির ব্যবহারে ততোটা দক্ষ নয়) একতা পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু একতা থেমে থাকেনি। অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে এই মহামারিকালেও লড়াই-সংগ্রামের বার্তাগুলো। পৃথিবীতে মানুষের শোষণমুক্তির লড়াই যেমন থেমে থাকে না, তেমনি একতার পথচলাও ক্লান্তিহীন। একতা স্রোতে গা ভাসাবে না। একতা চলবে স্রোতের বিপরীতে, যেখানে মানুষ তার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালাবে, তার সঙ্গে চলবে একতা। সেই অর্থে একতা এক সংগ্রামের নাম। একতা একটি শোষণহীন সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার অবিরাম সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। মুক্ত মানুষের মুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত একতার বিরাম নেই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..