মরার উপর খাঁড়ার ঘা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মরার উপর খাঁড়ার ঘা করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে সারাবিশ্বেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। প্রতিদিনই লম্বা হচ্ছে মানুষের লাশের সারি। উপায়হীন, বিপদগ্রস্ত মানুষ নিজেকে ঘরবন্দি করে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তাতেও রক্ষা মিলছে কই! তার মধ্যেই মরার উপর ঘাঁড়ার ঘা হিসেবে একেবারে উপকূল বরাবর তাণ্ডব চালিয়ে গেল ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’। এটাকে গত দুই দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশ-বিদেশের আবহাওয়াবিদরা। যদিও আম্পান শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে সেই শক্তি নিয়ে আঘাত করেনি। তবু সরকারি হিসাবেই ১০ জনের অধিক মানুষ মারা গেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যা ৭৫ এর কাছাকাছি। তবে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর অঞ্চলের জনপদের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনার কারণে এমনিতেই অধিকাংশ মানুষ এখন কর্মহীন। হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই। কোনোমতে সময়টা অতিক্রম করছিল মানুষ। এর মধ্যে অনেক মানুষের ঘর-দুয়ার ভেঙে গেছে। বলতে গেলে, হাজার হাজার মানুষ এখন গৃহহীন হয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যেখানে এখন দুমুঠো অন্নের সংস্থান করাই প্রান্তিকপর্যায়ের মানুষের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ, সেখানে এখন নতুন করে ঘর তোলার অর্থ সেই মানুষটি কোথায় পাবে? ঝড়ের তাণ্ডবে পড়ে রাতারাতি এভাবে গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষের পাশে অবশ্যই সরকারকেই দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি মানুষের বাসস্থানের অঙ্গীকার করেছে এই সরকার। এখন সময় সেইসব মানুষদের পাশ দাঁড়ানোর আর তাদেরকে ঘর করে দেওয়ার। আম্পানে কয়েক লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে বোরো ধানও রয়েছে। তবে বেশি ক্ষতি হয়েছে রবিশস্যের। ক্ষেতে তিল, তিসি, মরিচ, চীনাবাদামের মতো রবিশস্য হারিয়েছে কয়েক লাখ কৃষক। তার উপরে আছে, লবণাক্ত পানির ক্ষেতে ঢুকে পড়া। এই পানি না সরা পর্যন্ত ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষিদের কিছুই করার নেই। সরকার বলছে, এসব ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বিনামূল্যে সার, বীজসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হবে। কিন্তু সেটা দ্রুত যেন কৃষক পায় সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। কারণ, প্রতিটি ক্ষেত থেকে একজন কৃষক সারাবছর চার থেকে পাঁচটি রবিশস্যের আবাদ করে থাকে। এখনি এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে না দাঁড়ালে দেখা যাবে, এর মধ্যেই তার একটি ফসল নষ্ট হয়ে গেছে, প্রস্তুতি নিতে না পারলে সামনে হয়তো আরেকটি ফসল তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। ফলে তার দ্বিগুণ ক্ষতি হবে। যার প্রভাব পড়বে তাঁর জীবন-ধারনে, বেঁচে থাকায়। এ ছাড়া বিশেষ করে এসব অঞ্চলের আম বাগানের প্রায় ৭০ ভাগ আম ঝরে পড়ে গেছে। এটা একটা বিরাট ক্ষতি। কারণ, ঝড়ে শুধু আম পড়েনি। গোটা গাছটাই পড়ে গেছে অনেকক্ষেত্রে। এক বছর আমের পয়সা না পেলে চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আরেক বছরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু যার গাছটাই উপড়ে গেছে সে তো পথে বসে গেল। কারণ, গত ২০ বছর ধরে যত্ন করে তোলা গাছটাই তো এই মৌসুমে এসে পয়সা দিত; একরাতে সেই গাছ দুমড়ে-মুছড়ে পড়েছে তারই আরেকটা টিনের ঘরে। চাষির এই ক্ষতি কী করে পোষাবে! সেই মানুষ তো বড় অসহায় আজ। একই অবস্থা চিংড়ী খামারীদের। খামারের পর খামার ভেসে গেছে জলের তোড়ে। যারা বড় খামারি, তারা হয়তো আবার ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন, কিন্তু ক্ষুদ্র আমচাষি, চিংড়ী খামারি তার কী হবে? সরকার এরই মধ্যে একটা ঘোষণা দিয়েছে, বাগান মালিকদের ঝরে পড়া আম ত্রাণ হিসেবে কিনে নেওয়া হবে। এটা নিঃসন্দেহে ঘোষণা হিসেবে ভাল, শুনতেও ভাল লাগে। কিন্তু এই ঘোষণা কার্যকরী করতে করতে আম পচে গন্ধ বের হবে না তো? সরকারি উদ্যোগ বলে কথা! এসব কথার ফুলঝুরি না ঝরিয়ে সরকারের উচিত সত্যিকার অর্থেই যারা এই ঝড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো, তাদেরকে সহায়তা দেওয়া। কমিউনিস্ট পার্টি গণমানুষের পার্টি। মানুষের সুখে-দু:খে পাশে থাকাই এই পার্টির কর্মীদের একান্ত দায়। ঘূর্ণিঝড়ের আগ থেকেই পার্টির সংশ্লিষ্ট জেলার নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এই মহামারীর কালে যতোটা সম্ভব নিজের জীবন রক্ষা করে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। এরই মধ্যে পার্টির কর্মীরা সেই কাজ শুরু করেও দিয়েছে নানাভাবে। পাশাপাশি সরকারেরও উচিত শুধু ‘বন্দনাগীতি’ না করে এসব অসহায় মানুষ যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে তার জন্য যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..